পুষ্পধারা প্রপার্টিজ লিমিটেড রাজধানীর ঢাকার মালিবাগে রাজকীয় অফিস কিনে ‘মহাপ্রতারণা’র ফাঁদ পেতেছে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
প্রথম দেখাতে মনে হতে পারে কোনো আলিশান হোটেলের ফ্লোর! কিন্তু না; একটু ভালো করে খেয়াল করলে চোখে পড়বে আলিশান কক্ষে পদ-পদবি নিয়ে বসে আছেন একাধিক ‘প্রতারক’! যারা মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের ষোলঘর, কেওটখালী মৌজায় নামমাত্র জমি দেখিয়ে সহজ-সরল মানুষের সঞ্চয় হাতিয়ে নিচ্ছেন।
ঢাকা অফিসের চাকচিক্য; দুএকজনের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়কে পুঁজি করে নানা-শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে প্লট বিক্রি করছেন তারা, অথচ কাগজে-কলমে যে প্লটের অস্তিত্বই এখনো সৃষ্টি হয়নি।
সরেজমিন মালিবাগ অফিস, ষোলঘরের ‘পুষ্পধারা প্রপার্টিজের’ সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম, নৈরাজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে। ‘ভুক্তভোগীরা’ বছরের পর বছর প্লটের জন্য কিস্তি প্রদান করেও বুঝে পায়নি একটুকরো জমি। এসব গ্রাহকের ঘামের টাকায় এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু রাজধানীর বুকে ‘৫ তারকা হোটেল’সদৃশ অফিস স্পেস নয়, এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ পরিচালকরা ঢাকা শহরে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে নিজেকে ‘কেউকেটা’রূপে প্রকাশ করছেন।
তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া খবরের সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিস, জেলা অফিসে খোঁজ নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির প্রতারণার ‘রগরগে’ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতারণায় ঢাল হিসেবে ব্যবহার হয়েছে ‘ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ বিঘা জমি আবাসনে ব্যবহারের অনুমতি’।
এই অনুমোদন পেয়েছে এক বছরও হয়নি। অথচ গত ১০ বছর ধরে হাজার হাজার গ্রাহকের কাছে শত শত বিঘা প্লট বিক্রি করেছে পুষ্পধারা। আকর্ষণীয় হেড অফিস-ব্যক্তিত্ব, লোভনীয় নকশা (পদ্মা সেতুর রেল লাইনের পাশে), জমির দাম চৌম্বকগতিতে বৃদ্ধির প্রলোভনে এখন নিঃস্ব হবার পথে পুরনো গ্রাহকরা।
এতেই ক্ষান্ত নয় প্রতিষ্ঠানটি, এরই মধ্যে আড়িয়াল বিলকে ঝুঁকিতে ফেলে নিজেদের কেনা জমির বাইরে মাটি ভরাট করেছে। এই বিলের পানিপ্রবাহ আটকে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি জোর-দখল করে আবাসান এলাকার সঙ্গে মূল সড়কের সংযোগ রাস্তাও অনেকখানি নির্মাণ করে ফেলেছে তারা।
শ্রীনগরের হাসপাতাল ব্যবসায়ী দেলোয়ার আছেন পুষ্পধারার চেয়ারম্যান হিসেবে। তিনি শ্রীনগরে প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে আবাসন এলাকায় ‘দখলদারিত্ব রক্ষা’ করে চলেছেন।
অন্যদিকে শেরপুরের সাবেক এমপি আতিউর রহমান আতিক ও মতিয়া চৌধুরীর ‘ঘনিষ্ঠজন’ দাবিদার মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ওরফে শাশ্বত মনির প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন । যিনি প্রয়াত মতিয়া চৌধুরীকে নিজের ‘মামী’ পরিচয় দিয়ে ঢাকায় বসে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করতেন।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পলাতক মেয়র ফজলে নূর তাপস, ব্যারিস্টার সুমনের সহযোগী বলেও বিভিন্ন সময়ে নিজেকে পরিচয় দেন। এমনকি নিজেকে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে প্রতারণায় অংশ নেন। যখন যেখানে যেমন, তেমন পরিচয় দেয়া তার বহু পুরনো অভ্যাস।
মনিরুজ্জামান পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এই ফাউন্ডেশনের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। এক সময় বিসিএস কোচিং সেন্টার ওরাকলে ১৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান (শাশ্বত মনির)। প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় ওরাকল থেকে চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। এরপর ডেসটিনির ভূঁইফোড় কিছু লোককে নিয়ে গড়ে তোলেন পুষ্পধারা প্রপার্টিজ লিমিটেড।
পুষ্পধারার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলীনূর ইসলাম ছিলেন ডেসটিনির প্রতারণা চক্রের সদস্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাসের অধিকাংশ সময়ই দেশের বাইরে বিলাসিতায় সময় কাটে তার।
আওয়ামী লীগের সময়ে টাকাপয়সা কামিয়ে নিয়েছেন মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ওরফে শাশ্বত মনির। অফিসে গেলে এখনো মিলতে পারে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের ছবি। এই সব ছবি দেখিয়েই দীর্ঘদিন তিনি গ্রাহকদের ঘামের টাকা লুট করেছেন প্লট দেয়ার নামে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সুযোগ-সন্ধানী শাশ্বত মনির আওয়ামী ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে থাকা তার ছবিগুলো গায়েব করে ফেলেছেন। এখন বড় ভাই অতিরিক্ত সচিব শাহ মুহাম্মদ আবু রায়হান আলবেরুনীর নাম ভাঙিয়ে চলছেন প্রতারক মনির। তার ভাই আলবেরুনী আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধা পেয়ে ট্যারিফ কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান। এরপর সরকার পতনের পর নিজেকে বঞ্চিত সচিব হিসেবে দাবি করে সরকারের কাছে পদোন্নতির জন্য দেনদরবার করেন।
আওয়ামী আমলে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে শাহ মুহাম্মদ আল বেরুনী ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ভারত, নেপাল, ভুটান, সৌদি আরব, মায়ানমার, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, জাকার্তা, জাভা, তিমুর, বান্দুং ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশ যেমন ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, নিউ ক্যারিলিনা, ওয়াশিংটন ডিসি, ভার্জিনিয়া ও নিউইয়র্কসহ বেশ কিছু অঞ্চল ভ্রমণ করেন। শ্বাশত মনির এখন তার ভাইকে ব্যবহার করছেন ফ্যাসিস্ট গন্ধ মুছে ফেলতে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও থেমে নেই দোসর মনিরুজ্জামান। তিনি এখনও যেখানে যেমন দরকার আওয়ামী লীগের নামও ভাঙাচ্ছেন। অথচ এই মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ছিলেন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিপক্ষের শক্তি।
গ্রাহকদের টাকায় পুষ্পধারা ঢাকার মালিবাগে জেমকন টাওয়ারে গড়ে তুলেছে বিলাসবহুল অফিস। এ ছাড়া প্যারামাউন্ট টাওয়ার, রাজধানীর সেনাকল্যাণ ভবনে রয়েছে একাধিক অফিস। গ্রাহকের টাকায় মাঝেমধ্যে বিদেশে ভ্রমণ করেন মনিরুজ্জামান ও পুষ্পধারার শীর্ষকর্তারা। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলীনূর ইসলাম সবসময় থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন তারা। প্রবাসী মানুষদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও রয়েছে পুষ্পধারার একাধিক দালাল সিন্ডিকেট।
প্লট কেনার ৫ বছরের মধ্যে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তা গ্রাহকরা বুঝে পাচ্ছেন না দশ বছরেও। এ নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের শেষ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক বলেন, ‘আমি ১৫ বছর মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করতাম। সারাজীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলাম পুষ্পধারার প্লট কিনতে গিয়ে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পাঁচ বছর পরও প্লট বুঝে পাইনি। এখন শুনছি যে প্লট আমার কাছে বিক্রি করেছে, তা তাদের নয়। অন্য মানুষের জমি বিক্রি করেছে আমার কাছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করায় স্থানীয় সন্ত্রাসী দিয়ে হুমকি দিয়েছে। এখন জানের ভয়ে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিও করতে পারছি না।’
প্রায় একই কথা বলেছেন আরেক গ্রাহক। এই নারী গ্রাহক কিস্তিতে প্লট কিনেছিলেন পুষ্পধারার কাছ থেকে। টাকা পরিশোধের পরও প্লট বুঝে পাননি।
তিনি বলেন, ‘আলিশান অফিস দেখে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। তাদের মিষ্টি কথায় বুঝতেও পারি নেই যে তারা এতো বড় প্রতারক।’
তিনি জানালেন, পুষ্পধারার নামে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পুষ্পধারার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে এই প্রতিবেদক মালিবাগে জেমকন টাওয়ার অফিসে গেলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। সেখান থেকে জানানো হয়, সৈয়দ আলীনূর ইসলাম কিংবা মনিরুজ্জামান অফিসে নেই।
এরপর শাশ্বত মনিরের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ হলে তিনি চা পানের আমন্ত্রণ জানান। তাকে এ প্রতিবেদক ঢাকা এক্সপ্রেস অফিসে চা পানের আমন্ত্রণ জানালে ‘সময়ের অভাবে’র অজুহাত দেখান। আর অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য চাইলে কালক্ষেপণ করেন। কয়েকবার হোয়াইসআপে মেসেজ করলে দেখার পরও বক্তব্য দেননি।
এমডি আলীনূরকেও এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য একাধিকবার ফোন করা হয়। মেসেজ পাঠানো হয়। তিনি রেসপন্স করেন নাই।